You are here: Home / গল্প / ওয়র্ম লেডার

ওয়র্ম লেডার

মাঠে খেলতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল সারজিসের। বড় ভাই কারজিসও আছে। মায়ের কড়া নির্দেশ সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঘরে ঢুকতে হবে। মাগরিবের আজান হয়েছে বেশ আগে। খেলা শেষ হচ্ছিল না তাই উত্তেজনায় কিছুই মনে ছিল না। সারজিস বড় ভাইকে বলল, এখন কী হবে? বড় ভাই হাসতে হাসতে বলল, দেরি যখন হয়েই গেল, আরেকটু খেলে নিই। এখন গেলেও মার খাবি, পরে গেলেও মার খাবি। খেলাধুলা শেষ করে দুই ভাই যখন বাড়ি দিকে যাচ্ছে তখন সন্ধ্যা শেষ হয়ে গেছে, অন্ধকার গাঢ় হয়ে বসেছে।

কারজিস বলল, তুই আস্তে আস্তে হাঁট, আমি একটু প্রস্রাব করে আসি। সারজিস বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল। একটু সামনেই তাদের বাড়ি। চোখ বন্ধ করে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। সারজিস গুটি গুটি পায়ে তাদের ঘরের পিছনে চলে গেল। ঘরের পিছনে সারজিস ও কারজিসের কক্ষের জানালা বরাবর একটি সুপারি গাছ আছে। যেহেতু তাদের ঘরটি খুঁটির উপর তাই জানালা বেশ উপরে। জানালার পাল্লা খোলা থাকলে এই সুপারি গাছ বেয়ে তারা উপরে উঠে যায়। জানালার দিকে গাছ কাত করে ঢুকে পড়ে। জানালার পাল্লা খোলা থাকলেই হল। জানালায় কোনো রড বা কোনো কিছু নেই। জানালার দিকে তাকিয়ে সারজিসের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
জানালার পাল্লা দুটো হালকা খোলা অর্থাৎ ভেতর থেকে লাগানো নেই। তাছাড়া সেখানে ছোট একটি মই রাখা আছে। কোনো কাজে হয়তো মই আনা হয়েছে। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল কারজিস আসছে। তাকে হাত তুলে ইশারা করল। তারপর দ্রুত মই বেয়ে উঠতে লাগল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দুলুনী, এরপর আপনা-আপনিই নিজের কামরার মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল। প্রতিদিন পাড় হতে সে লাফিয়ে পানিতে পড়ে। পানিতে আছাড় খাওয়ার মতোই অনুভূতি হলো তার। দ্রুত উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল মা কোথায় আছে। ঠিক তখনই দেখা গেল নিজে নিজে বকাবকি করতে করতে মা তাদের কক্ষের দিকে এল। সারজিস আশ্চর্য হয়ে গেল! রুমের দরজায় সে ভিতর থেকে বাইরের দিকে উঁকি দিচ্ছিল। মা প্রায় তার উপর দিয়ে কক্ষে ঢুকল। অথচ তাকে দেখেনি। ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে ফিরল। মাথা নিচু করে রেখেছে। অপেক্ষা করছে কখন উত্তম মধ্যম শুরু হবে। কিন্তু মা তাকে কিছু বলছে না কেন? আজকে আসুক দুই ভাই। পিঠের ছাল উঠিয়ে ফেলব। আর তখনই দেখা গেল জানালা দিয়ে কারজিস লাফিয়ে পড়ল। ভয়ে সারজিস চোখ বন্ধ করে ফেলল। কানে শুনছে বড় ভাই কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলছে, মা মাফ করে দাও। আর কখনই এমন হবে না। চোখ খুলে দেখে কারজিস মায়ের পা ধরছে। মা যথারীতি কথা বলেই যাচ্ছে। কারজিসকে দেখেছেন বলে মনে হচ্ছে না। কিছু একটা হয়েছে। কারজিসকে বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে। কারজিস পা ধরার চেষ্টা করছে কিন্তু ধরতে গেলে কিছুই নেই।
এবার সোজা দাঁড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু না, কিছুই নেই। সে একটু ভয় পেয়ে গেল। সারজিস ভাবছে তবে কি মা অশরীরি হয়ে গেল? না-কি মায়ের ছবি ধরে কোন ভূত এল? সেও দৌড়ে গিয়ে মাকে ধরল, কিন্তু না, সেখানে কিছুই নেই। এদিকে বকতে বকতে মা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। ভয়ে দু’ই ভাই কিছুক্ষণ জড়সড় হয়ে থাকল। একটু পর সারজিস দেখল, বড় ভাই তাকে কিছু বলছে। অর্থাৎ তার মুখ নড়ছে, কিন্তু সে কিছুই শুনছে না। সারজিস বলল, এসব কী হচ্ছে ভাইয়া? কিন্তু তার কথা করজিস শুনছে বলে মনে হচ্ছেনা। বিভ্রান্ত দুই ভাই একে অপরকে ধরতে গেল। কিন্তু সেখানে কোনো কিছুরই স্পর্শ পেল না। দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরল, না কোনো কিছুর অস্তিত্বই পেল না। ভয়ে কান্না শুরু করল দু’জন। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘাটের উপর দু’জনই ঘুমিয়ে পড়ল।

ওয়র্ম লেডার
কান্না, হৈ-হুল্লোড় আর চিৎকার-চেচাঁমেচিতে সারজিসের ঘুম ভেঙে যায়। তাদের কামরায় পাড়া-পড়শি, মা-বাবা ও কিছু আত্মীয়-স্বজনসহ অনেক লোক। তার শরীরের উপরও তিনজন বসে আছে। কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না। সে উঠে বসল। তাতে কোনো অসুবিধা হল না। মা চিৎকার করে কাঁদছে। কোথায় গেল আমার মানিক জোড়া। মায়ের এমন কান্না সে কখনও দেখেনি। সব সময় মনে হতো মা শুধু মারে। কিন্তু এখন সে অনুভব করছে মা তাদের কত ভালবাসে। চোখ দুটো তার ভিজে গেল। চিৎকার করে বললো মা এই যে আমরা এখানে। কিন্তু তার কথা সে নিজে ছাড়া আর কেউই শুনল না। অথচ অন্যদের সব কথা সে শুনছে। মা কান্না করেই যাচ্ছে, বাবারা তোরা ফিরে আয় আমি আর কোনো দিন তোদেরকে মারব না। কারজিস ইতোমধ্যে উঠে বসছে। সে চিৎকার করে বলল, মা আর কোনো দিন তোমার অবাধ্য হবো না। আমাদেরকে বের করে নিয়ে যাও।
তাদের বাবা জাপান গেছেন ব্যবসার কাজে। তিনি শুনলে অবস্থা কী হবে সেটা আলোচনা করছেন ওদের ছোট চাচা খবির উদ্দিন। পাশের বাড়ির পাটোয়ারী জ্যাঠা বলে আজকাল পোলাপান দুষ্টামীও করে বেশি। এদেরকে একটু কন্ট্রোলে রাখতে হয়। মেজো মামা বললেন, বুবু চিন্তা করিস না। তুই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়। আমি ব্যাপারটা দেখছি। মা আরও জোরে কেঁদে উঠল, ভাই তুই আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুল নোর চেষ্টা করবি না, পারলে কিছু কর। শোন বুবু এসপি জাহেদ আমার বন্ধু। তাকে আমি সব জানিয়েছি। গোটা জেলা সার্স করা হচ্ছে। সকাল নাগাদ ইনশাআল্লাহ খবর পেয়ে যাব। কারজিস বাথরুমে গেল। সব জিনিসই তার ব্যবহার্য ও পরিচিতি। কাজ শেষে কোনো পানি পেল না। ভাগ্য ভালো টয়লেট, টিস্যু পেল। একদম নতুন টয়লেট, টিস্যু। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে সকালে যখন দেখেছে তখন টিস্যুটি প্রায় অর্ধেক ছিল।
সারজিস রহস্যঘেরা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের দৃশ্য দেখে সে জমে গেল। একেবারে দিনের আলো ঝলমল করছে। জাানালার কাছে সুপারি গাছটি নেই। ঐ যে ওখানে টিউবওয়েল থাকার কথা, কিন্তু নেই। আরে মাটির রং দেখা যাচ্ছে গোলাপী। দৃষ্টি আরেকটু দূরে গেলে আবারও চমকে উঠল। তাদের ঘরের মতো হুবহু আরেকটি ঘর ওখানে। ঐ ঘরের জানালায় সে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে বলে উঠল, সর্বনাশ! দুইটা আমি? আরে ঐ ঘরেও তো অনেক মানুষ। যারা এই ঘরে আছে। মা-কেও দেখা যাচ্ছে। বাথরুম থেকে কারজিসকে বের হতে দেখল। ওই যে কারজিসও দুই জন। সারজিসের কিশোর মাথা আর কাজ করে না। আগপিছ চিন্তা না করে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ল নিচে। এত উপর থেকে পড়লেও যেভাবে ব্যথা পাওয়ার কথা সেভাবে ব্যথা পায়নি। তবে প্যান্টের সাথে গোলাপী মাটি লেগে গেল। সামনের ঘরের জানালায় নিজেকে দেখল না। সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে কারজিস। দূর থেকে সারজিসকে দেখ সেও লাফিয়ে পড়ল। দুই ভাই একে অপরের দিকে দৌড়াতে লাগল। হাফাঁতে হাঁফাতে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে। অনেকক্ষণ দু’জন কাঁদল। স্বাভাবিক হয়ে কারজিস বলল এ কী হলো আমাদের? সারজিস বলল, দেখ ভাই দু’টি ঘরই আমাদের ঘরের মতো। আমি নিশ্চিত এর একটিও আমাদের ঘর নয়। দেখো দু’ঘরেই একই লোকদের দেখা যাচ্ছে। দেখো এখানকার মাটি গোলাপী। গাছ-পালার রং হলুদ, পাতার রং সাদা আর কোনো ঘর-বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। আমাদের জানামতে এখন গভীর রাত। অথচ এখানে দিনের আলো ঝলমল করছে। দেখ সূর্যটি কত বড় মনে হচ্ছে। আমাদের যে সূর্য তার প্রায় পাঁচগুণ বড় হবে।
কারজিস লাফিয়ে উঠল, তাহলে আমরা কোথায় আসলাম? এ কীভাবে সম্ভব, এখন আমাদের কি হবে? ইস! ময়ের কথা যে কেন শুনলাম না? সামনের গাছ থেকে কে বের হল! দুজনই ভীষণ চমকে উঠল। অস্পষ্ট ছায়া আস্তে আস্তে স্পষ্ট হলো। একজন মানুষ। ভূত মনে করে দু’জনই দৌড় দিল দু’দিকে। এই বাচ্চারা দাঁড়াও, তোমরা বাড়িয়ে ফিরে যাবে?। কথাটা শুনে দ’ুজনই থমকে দাঁড়াল। পিছন ফিরে দেখে লোকটি হাসছে। লোকটি এগিয়ে আসছে দেখে তারাও ভয়ে ভয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। লোকটি মোটামুটি বয়স্ক। দেখলে দাদার কথা মনে হয়। কেমন মায়াবী চোহারা দু’জনেরই ভয় দূর হয়ে গেল। তিনি বললেন আমি প্রফেসর তানজিল ইউসুফ। তোমাদের খবর কী?
দু’জনেই আগাগোড়া ঘটনা বলল। তিনি বললেন, এসব তো আমি জানি। যেটা জানি না সেটা হচ্ছে তোমরা মাকে ভালোবাস কিনা? দুজনেই সমস্বরে বলল মাকে অনেক বেশি ভালোবাসি। তাহলে তার কথা শোন না কেন? কাঁদতে কাঁদতে তারা বলল এখন থেকে সব সময় শুনব। ঠিক আছে তোমাদের মামা তোমাদের নিয়ে মায়ের কাছে যাবে। ঘর দু’টিতে যে যেখানে ফিরে যাও। জানালা দিয়ে মই বেয়ে নামবে। সারজিস বললো, আচ্ছা যাচ্ছি, কিন্তু কীভাবে কী হল যদি বলতেন? প্রফেসর মুচকি হাসি দিয়ে বললেন এসব পদার্থ বিজ্ঞানের বিষয়। বড় হলে জানবে। তবে এটুকু বলে রাখি, যে মই বেয়ে তোমরা জানালা দিয়ে ঘরে উঠতে গিয়েছিলে সেটি একটি ওয়ার্মহোল। আমি নাম দিয়েছি ‘ওয়ার্ম লেডার’। পৃথিবীতে আমিই এটি তৈরী করতে সফল হয়েছি। আমরা এখন পৃথিবী থেকে বিশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে নক্ষত্রের গ্রহে আছি। আলোর গতিতে চললেও পৃথিবীতে যেতে বিশ কোটি বছর লাগবে। কিন্তু ওয়ার্ম লেডারে পা দেয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তোমরা পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে। তোমাদের মামা কাশেম আমার বন্ধু। কখনও যদি এমন দুষ্টামী কর তাহলে আরও দূরের গ্রহে পাঠিয়ে দেবো। দুই ভাই দুই ঘরে উঠল অনেক কষ্টে। ঘরে তখনও মায়ের কান্না থামেনি। তবে মেজ মামা ঘরে নেই। আবার জানালায় উঁকি দিয়ে দুজনেই মই দেখতে পেল। এখন তারা জানে এটি ওয়র্ম লেডার। পা রাখতেই অন্ধকারে আঁচড়ে পড়ল। শব্দ হতেই মেজ মামা কাশেমের কণ্ঠ এত দেরি করলি কেন, আয়। দু’জনেই বলল, মাকে কী জবাব দেব। মেজ মামা হাসি দিয়ে বললেন, তোদের কিছু বলতে হবে না। আমিই বলব। তিনজন ঘরের দিকে পা বাড়ালো।

You understand that when using the curriki site you https://writemypaper4me.org/ will be exposed to contributions from a variety of sources, and that curriki is not responsible for the accuracy, usefulness, or intellectual property rights of or relating to such contributions

.

About মোস্তাফিজুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Scroll To Top